রংপুরসারাদেশ

স্বাভাবিক প্রসবেই সাফল্য দেখছে খানসামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

অস্ত্রপচার (সিজারিয়ান) ছাড়াই সন্তান প্রসাব হলে সবাই এখন বলেন, ‘নরমাল ডেলিভারি’ হয়েছে। যেটা যেভাবে হওয়া উচিত, সেটা হলেই তো নরমাল বা স্বাভাবিক। কিন্তু সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে এই স্বাভাবিকটাই যেন দিন দিন ভয়ানকভাবে অস্বাভাবিক হয়ে উঠছে। এখানেই অনন্য সাফল্য দেখিয়ে চলেছে দিনাজপুরের খানসামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। সেখানে প্রতিবছর বাড়ছে স্বাভাবিক সন্তান প্রসব।

২০১৭ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে বা বিডিএইচএসের জরিপে দেখা যায়, দেশে স্বাভাবিক প্রসব ৬২ দশমিক ১ শতাংশ, সিজারিয়ান ৩৫ দশমিক ৫ এবং অন্যভাবে ২ দশমিক ৫ শতাংশ সন্তানের জন্ম হয়।

সিজারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব কত দ্রুত বাড়ছে তা বিডিএইচএসের তথ্য থেকে বোঝা যায়। তাদের তথ্য বলছে, ২০০৪ সালে দেশে সিজারের মাধ্যমে সন্তান হতো ৪ শতাংশ, ২০০৭ সালে ৯ এবং পরে ২০১১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭ শতাংশে। ২০১৭ সালে এই সংখ্যা হয় ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ১০-১৫ শতাংশের বেশি প্রসূতি মায়ের সিজারের প্রয়োজন হতে পারে না। মায়ের অবস্থা সংকটাপন্ন হলেই কেবল সিজারের সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ধাত্রী রমা রায় বলেন, ‘স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নানা উদ্যোগের কারণে স্বাভাবিক প্রসবের সংখ্যা বাড়ছে এবং স্বাভাবিক প্রসবে প্রসূতিদেরও আগ্রহ বাড়ছে। কারণ, হাসপাতালে নিরাপদে স্বাভাবিক প্রসব করানো হলে প্রসূতি ও নবজাতকের মৃত্যুঝুঁকি থাকে না। তা ছাড়া এভাবে প্রসবে বাড়তি কোনো অর্থও ব্যয় হয় না।’

খানসামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত নার্স জেসমিন আরা বেগম জানান, এই হাসপাতালে একসময় স্বাভাবিক সন্তান প্রসবের কোনো পরিবেশ ছিল না। কিন্তু ২০১৬সালে পাল্টে যায় চিত্র। এই উদ্যোগে আরও ছিলেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) শামসু্দ্দোহা মুকুল, মেডিকেল অফিসার ডাঃ প্লাবন রায়, ডাঃ মৌরিন আক্তার , ডাঃআশিক,ডাঃ হেনা সহ আরো অনেকে।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাভাবিক প্রসব হওয়া সালমা বেগম বলেন, ‘ব্যথা ওঠার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে ভর্তি হই। অন্য কোথাও ভর্তি হলে হয়তো অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে প্রসব করানো হতো। আমরা তাঁর জন্য প্রস্তুতও ছিলাম। তবে এখানকার চিকিৎসক, নার্স ও ধাত্রীদের পরামর্শে আমি সাহস পাই এবং আমার প্রসব স্বাভাবিক হয়েছে।’

শুরুর সেই অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে (আরএমও) শামসু্দ্দোহা মুকুল জানান । ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর দেখতে পাই হাসপাতালে গর্ভবতী মায়েদের প্রসবের ব্যবস্থা তেমন ছিরো না । প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মায়েরা প্রসব বেদনা নিয়ে এলে হাসপাতালের বারান্দা থেকেই তাঁদের জেলা শহরে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। শুরু হয়ে যেত দালালদের তোড়জোড়। নানা অজুহাতে উপজেলার বিভিন্ন ক্লিনিকে নেওয়া হতো। অনেক রোগী অর্থাভাবে কোথাও যেতে চাইতেন না। তাঁদের দিকে তাকিয়েই হাসপাতালে স্বাভাবিক সন্তান প্রসব চালুর সিদ্ধান্ত নিই।’তবে শুরুটা সহজ ছিল না মোটেও। আমাদের কাছে উপজেলার প্রসূতি নারীদের একটি ডেটাবেইস রয়েছে। নিয়মিত তাঁদের খোঁজখবর নেওয়া হয় এবং প্রসব-পূর্ববর্তী ও পরবর্তী চিকিৎসা ও পরামর্শ দেওয়া হয়। তাই নিয়মিত স্বাভাবিক প্রসবের সংখ্যা বাড়ছে।‘সহকর্মীদের সহযোগিতা আর সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ছিল। সমাজসেবা বিভাগের সহযোগিতায় নবজাতকদের উপহার দেওয়ার ব্যবস্থা করি। বিশেষ ফান্ডের মাধ্যমে প্রসূতি মায়েদের অতিরিক্ত ওষুধের ব্যবস্থাও করা হয়। সচেতনতা বাড়াতে গ্রামে গ্রামে গিয়ে করা হয় উঠোন বৈঠক। চালু করা হয় বিনা মূল্যে ‘প্রসূতি কার্ড’। সন্তান প্রসব না হওয়া পর্যন্ত চলতে থাকে কাউন্সেলিং আর ফ্রি চেকআপ। বর্তমানে এখানে প্রসব নিরাপদ করতে ৬ জন দক্ষ মিডওয়াইফ নার্স আছেন। এই কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ধন্যবাদ জানাই। পাশাপাশি আবার বেড়েছে দালালের উপদ্রব। উপজেলায় বেশ কয়েকটি ক্লিনিক গড়ে ওঠায় তৎপরতা বেড়েছে দালালচক্রের।

সাফল্যের পরিসংখ্যান
এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২০১৯ সালে স্বাভাবিক প্রসব হয় মাত্র ১১৫১টি। ২০২০ সালে তা দাঁড়ায় ১৪৯১টিতে। ২০২১ সাল থেকে পাল্টে যেতে থাকে এ চিত্র। উদ্যোগের সেই প্রথম বছরে ১৬৮০টি সন্তান প্রসব হয় স্বাভাবিকভাবে। পরের বছর ২০২২ সালে ১৩২৬ টি, ২০২৩ জানুয়ারী শুরু থেকে এখন পযন্ত ১০২টি স্বাভাবিক প্রসব হয়।

খানসামা উপজেলার পাশের দুই উপজেলার চিত্রটা দেখে নিলে বোঝা যাবে খানসামার অনন্যতা। খানসামার পাশের বীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২০১৯ সালে স্বাভাবিক সন্তান প্রসব হয়েছে ৮০২ টি, ২০২০ সালে ৫৪৪ ও ২০২১ সালে ৬৪৯, ২০২২ সালে ৭১৮ টি । আর জেলার চিরিরবন্দর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২০১৯ সাল ৫২০টি, ২০২০ সালে ৫৫৬, ২০২১ সালে ৫৪০, ২০২২ সালে হয়েছে ৬২২ টি স্বাভাবিক প্রসব।

স্বীকৃতি
সাফলের স্বীকৃতি হিসেবে খানসামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কয়েক বার বিভাগের সেরা হাসপাতালের তালিকায় রয়েছেন । আর সাফল্যের বিষয়টি জানার পর ২০২১ সালে থাইল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও জাপানের প্রতিনিধি দল হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বর্তমান উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হাছানুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘আমরা প্রসূতি মায়েদের প্রসব-পরবর্তী এক মাসের ওষুধ ফ্রি দিচ্ছি। অবৈধ ক্লিনিকভিত্তিক দালালদের কিছু তৎপরতা রয়েছে, তবে পুরোপুরি বন্ধ না করা গেলেও আমরা বিভিন্ন অনুমোদনবিহীন অবৈধ ক্লিনিকে অভিযান চালাচ্ছি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button