অপরাধজেলা সংবাদঢাকাসারাদেশ

ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নানা সংকটের মধ্যে খুঁড়িয়ে চলছে চিকিৎসাসেবা

ফরিদপুর প্রতিনিধি:

ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নানা সংকটের মধ্যে খুঁড়িয়ে চলছে চিকিৎসাসেবা। রোগীরা এক্স-রে, ইসিজির সুবিধা পেলেও দীর্ঘ ৯ বছর ধরে স্বাস্থ্য পরীক্ষার কোনো সুবিধা পাচ্ছেন না। পরীক্ষার সরঞ্জাম থাকলেও মেডিকেল টেকনোলজিস্টের (ল্যাব) পদ শূন্য থাকায় রক্ত, প্রস্রাবসহ ছয় ধরনের পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে এ অবস্থা চলছে। পাশাপাশি চিকিৎসক ও কর্মচারী-সংকট ভোগাচ্ছে রোগীদের। এমনকি এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একমাত্র অ্যাম্বুলেন্সটিও জ্বালানি তেলের সরবরাহ মাঝেমধ্যেই না পাওয়ায় পড়ে থাকছে। ২০ দিনের মতো বন্ধ থাকার পর সর্বশেষ গত ১২ এপ্রিল জ্বালানি তেলের বরাদ্দ পাওয়া গেছে।

 

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র জানায়, ১৯৭৭ সালে উপজেলা সদরের বিএস ডাঙ্গী এলাকায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি স্থাপন করা হয়। ৬ একর ৯৫ শতাংশ জমির ওপর ৫টি আবাসিক ভবন ও ১টি প্রশাসনিক ভবন নিয়ে ৩১ শয্যাবিশিষ্ট চরভদ্রাসন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কাজ শুরু হয়। ২০১২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য তৎকালীন নিলুফার জাফরুল্লাহ ৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ কাজের উদ্বোধন করেন। তবে এরপর ১১ বছর কেটে গেলেও ৫০ শয্যার কার্যক্রম শুরু হয়নি। ২০১৪ সালে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ২০১৭ সাল থেকে নতুন ভবনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৪টি চিকিৎসক পদ রয়েছে। এর বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ৮ জন। একজন আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) রয়েছেন। জুনিয়র কনসালট্যান্ট পদের পাঁচটি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন দুজন। শূন্য রয়েছে সার্জারি, শিশুরোগ ও অ্যানেসথেসিয়া-বিশেষজ্ঞের পদগুলো। চিকিৎসা কর্মকর্তাদের ছয়টি পদের একটি শূন্য।

 

স্টাফ নার্সের ২৩টি পদের সবাই কর্মরত থাকলেও এর মধ্যে ৫ জন প্রেষণে অন্যত্র কর্মরত রয়েছেন। এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক, নার্স, তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীসহ মোট পদ রয়েছে ৮৩টি। এর মধ্যে কর্মরত আছেন ৫৫ জন। ২৮টি পদ শূন্য।

 

১২ এপ্রিল সরেজমিনে বেলা ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ঘুরে দেখে এবং রোগীদের সঙ্গে কথা বলে বিভিন্ন সমস্যার কথা জানা যায়। এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক্স-রে ও ইসিজি করার সুযোগ রয়েছে। ১ থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে ৩৭টি এক্স-রে ও ২৬টি ইসিজি হয়েছে। তবে দীর্ঘ ৯ বছর ধরে মেডিকেল টেকনোলজিস্টের (ল্যাব) পদটি শূন্য থাকায় রক্তের বিভিন্ন পরীক্ষা, যেমন কিডনি, জন্ডিস, টাইফয়েড, ডায়াবেটিস ও প্রস্রাবের কোনো পরীক্ষা হচ্ছে না।

 

নারী ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন সদর ইউনিয়নের দক্ষিণ আলম নগর গ্রামের মৃত মো. আলাউদ্দিনের স্ত্রী ঝর্ণা বেগম (৫১) বলেন, ‘ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডাক্তার দেখানো গেলেও রক্ত ও প্রস্রাবের পরীক্ষা করা হয় না। এসব পরীক্ষার জন্য ক্লিনিকে যেতে হয়। সেখানে গেলে বিভিন্ন টেস্টে এক-দুই হাজার টাকা লেগে যায়। হাসপাতালে এসব পরীক্ষা করার সুযোগ থাকলে আমাদের খরচ বাঁচত।’

৩১ শয্যাবিশিষ্ট এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোট ওয়ার্ড রয়েছে পাঁচটি। এর মধ্যে পুরুষ ও মহিলা ওয়ার্ডে ১০টি করে মোট ২০টি শয্যা রয়েছে। এ ছাড়া ডায়রিয়া ওয়ার্ডে চারটি, শিশু ওয়ার্ডে তিনটি ও প্রসূতি ওয়ার্ডে চারটি শয্যা রয়েছে। এর বাইরে রয়েছে দুটি কেবিন।

১ থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত এক সপ্তাহে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ১০২ জন, জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ১২৬ জন এবং বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন প্রায় ১ হাজার ৬০০ রোগী।

পুরুষ ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন সদর ইউনিয়নের ডাঙ্গী গ্রামের বাসিন্দা মোস্তফা মণ্ডল (৫৫) বলেন, তিনি জ্বর-কাশির সমস্যা নিয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়েছেন। তিনি বলেন, ওয়ার্ডের শৌচাগারগুলো ঠিকমতো পরিষ্কার করা হয় না। রোগীর চাপ বেশি থাকলে শৌচাগারে দুর্গন্ধে ঢোকা যায় না। নাকমুখ বন্ধ করে থাকতে হয়।

এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান বলেন, অনেক সীমাবদ্ধতা নিয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি পরিচালনা করতে হচ্ছে। পাঁচজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর স্থলে রয়েছেন মাত্র একজন। তাঁর একার পক্ষে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সব কটি শৌচাগার পরিষ্কার করা এবং ওয়ার্ডগুলো পরিচ্ছন্ন রাখা দুরূহ। পাঁচজন অফিস সহায়কের স্থলে রয়েছেন দুজন। এ পদগুলো পূরণ করা গেলে আরও ভালোভাবে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব। তিনি বলেন, মামলার সমস্যার কারণে মেডিকেল টেকনোলজিস্টের (ল্যাব) পদটি শূন্য রয়েছে। তিনি বলেন, শূন্যপদগুলোতে লোকবল নিয়োগের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

হাফিজুর রহমান আরও বলেন, তবে এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসাসেবার মান ও পরিধি আগের চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে। আগে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক ছিলেন না, এখন রাতদিন যখনই রোগী আসুক না কেন, চিকিৎসক দেখাতে পারছেন। আগের থেকে বহির্বিভাগে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। রোগীরা নিয়মিত চিকিৎসক ও সেবা পাচ্ছেন বলেই রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button